Best Child Neurologist

সঠিক ব্যবস্থাপনায় স্বাভাবিক জীবন

২ এপ্রিল পালিত হয়েছে ১৮তম বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস। এ রোগে শিশুর স্বাভাবিক মানসিক বিকাশ ব্যাহত হয়। প্রাথমিক অবস্থায় এটি নির্ণয় করা গেলে চিকিৎসাব্যবস্থার মাধ্যমে এ রোগের উপসর্গ অনেকাংশে কমানো যায়। অটিজমের লক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার বিস্তারিত জানাচ্ছেন অধ্যাপক ডা. গোপেন কুমার কুণ্ডু

অটিস্টিক শিশুরা আমাদের সমাজেরই অংশ। তাদের অধিকার ও মর্যাদা সুরক্ষায় বিশেষ চাহিদাকে ইতিবাচকভাবে বিবেচনা  করা অপরিহার্য

অটিজম কী?

শিশুদের একটি স্নায়ুবিকাশ জনিত সমস্যা অটিজম বা অটিজম স্পেকট্রাম ডিস-অর্ডার। এর ফলে শিশুর সামাজিক যোগাযোগ ও কার্যকলাপ নানাভাবে বাধাগ্রস্ত হয়। অটিজমের ৮০-৯০ শতাংশ বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পায় শিশুর বয়স তিন বছর হওয়ার আগেই।

শিশুর সামাজিক যোগাযোগ ও পরিবেশের দিকে অনাগ্রহ থাকে, জড় জগৎ ও বস্তুর প্রতি থাকে অস্বাভাবিক সংবেদনশীলতা। পাশাপাশি তাদের মধ্যে দেখা যায় পুনরাবৃত্তিমূলক আচরণ, যেমন—তারা পারিপর্শ্বিকতায় পরিবর্তনকে মেনে নিতে চায় না। একক কোনো বিষয়ের প্রতি তৈরি হয় মাত্রাতিরিক্ত আগ্রহ। এর ফলে শিশুর সামাজিক সম্পর্ক স্থাপনে অসুবিধা হয়।

আশপাশের পরিবেশ এবং ব্যক্তির সঙ্গে মৌখিক ও ইশারা ইঙ্গিতের মাধ্যমে যোগাযোগ করতে পারে না। দেখা দেয় আচার-আচরণের সমস্যা।

রোগের প্রকোপের ওপর ভিত্তি করে অটিজমকে যেভাবে তিনটি ভাগ করা যায়—

►  অটিস্টিক ডিস-অর্ডার

 এসপারজার্স ডিস-অর্ডার

►  পারভাসিভ ডেভেলপমেন্টাল ডিজ-অর্ডার নট আদারওয়াইজ স্পেসিফায়েড।

অটিজমের ইতিহাস

লিওক্যানার সর্বপ্রথম ১৯৪৩ সালে অটিজমের লক্ষণের বর্ণনা দেন।

এই বিশেষ শিশুদের মধ্যে অন্য শিশুদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনে অসমর্থ্যতা পর্যবেক্ষণ করেন তিনি। ক্যানার আরো লক্ষ করেন যে, এদের মধ্যে রয়েছে পরিবেশের প্রতি অস্বাভাবিক ধরনের সাড়া প্রদান করার প্রবণতা, একই ধরনের আচরণের পুনরাবৃত্তি, কোনো বস্তুর প্রতি অস্বাভাবিক ভালো লাগা এবং রুটিন মেনে চলার প্রবণতা। এই অভ্যাসগুলো পরিবর্তন করতে চাইলে এই শিশুরা অস্বাভাবিক আচরণ করে। তিনি আরো অভিমত প্রকাশ করেন যে এই শিশুরা গুছিয়ে কাজ করায় পারদর্শী নয় এবং কখনো কখনো কিছু কাজের ক্ষেত্রে অসাধারণ দক্ষতার পরিচয় দিয়ে থাকে।

এরপর ১৯৪৪ সালে হানস অ্যাসপার্জার এটিকে ‘অটিস্টিক সাইকোপ্যাথি’ বলে সম্মোধন করেন।তিনি বলেন, এই শিশুদের আচরণের অস্বাভাবিকতা এবং সামাজিক মেলামেশায় অক্ষমতার কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

কাদের হয়?

ধর্ম-বর্ণ-আর্থ-সামাজিক অবস্থান-নির্বিশেষে যেকোনো শিশুর মধ্যে অটিজমের লক্ষণ দেখা দিতে পারে। তবে মেয়েদের তুলনায় ছেলে শিশুদের আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় চার গুণ বেশি।

লক্ষণ

১৮ থেকে ৩৮ মাস বয়সের মধ্যেই অটিজমের লক্ষণগুলো শিশুদের মধ্যে প্রকাশ পায়। এর মধ্যে আছে—

►  দুই বছর বয়সের মধ্যে অর্থপূর্ণ কথা বলতে না পারা।

►  শিশু চোখে চোখ রাখে না।

►  নাম ধরে ডাকলে সাড়া দেয় না।

►  অন্যের সঙ্গে মিশতে, আদর নিতে বা দিতে সমস্যা হয়।

►  পরিবেশ অনুযায়ী মুখ ভঙ্গি পরিবর্তন না করা।

►  অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন শিশুরা অন্য শিশুদের সঙ্গে মুখে মুখে কথা বলা এবং ইশারা-ইঙ্গিতের মাধ্যমে ভাবের আদান-প্রদান করতে পারে না।

এর পাশাপাশি অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন শিশুদের মধ্যে কখনো কখনো কিছু আনুষঙ্গিক অসুবিধা থাকতে পারে। যেমন—

►  খিঁচুনি

►  অতিমাত্রায় চঞ্চলতা

►  ঘুমের সমস্যা

►  খাদ্য হজমের সমস্যা ও কোষ্ঠকাঠিন্য

►  বুদ্ধি বা জ্ঞানের স্বল্পতা

►  দাঁত কিরমিরি দেওয়া ইত্যাদি।

অটিজম নিরূপণের জন্য চিহ্ন

শিশুর আচরণে যদি নিচের তালিকার একাধিক উপসর্গ দেখা দেয়, তাহলে অবশ্যই অটিজম বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে।

►  ছয় মাস বয়সের মধ্যে শিশু যদি পরিপূর্ণ হাসি না হাসে।

►  ৯ মাস বয়সের মধ্যে হাসির উত্তরে হাসি বা ভাব প্রকাশ না করে।

►  ১২ মাস বয়সের মধ্যে আধো আধো বোল না বলা, পছন্দের বস্তুর দিকে ইশারা না করে।

►  ১৬ মাসের মধ্যে কোনো একটি শব্দ বলতে না পারে।

►  ২৪ মাস বয়সের মধ্যে দুই বা ততোধিক শব্দ দিয়ে মনের ভাব প্রকাশ করতে না পারে।

►  ভাষার ব্যবহার রপ্ত করতে পারার পর আবার ভুলে যায়।

►  বয়স উপযোগী সামাজিক আচরণ করতে না পারে।

সম্ভাব্য কারণ

অটিজম কেন হয় সে বিষয়ে এখনো বিজ্ঞানীরা সুস্পষ্টভাবে অবগত নন। সারা বিশ্বেই এর মূল কারণ জানার জন্য গবেষণা অব্যাহত রয়েছে, বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। কিছু বিষয়ের সমন্বয়ে শিশুদের অটিজম হতে পারে বলে চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন। এর মধ্যে জিনগত কারণ সবচেয়ে গুরত্বপূর্ণ। এ ছাড়াও কিছু পরিবেশগত কারণও আছে। ধারণা করা হয়, অটিজমের জন্য দায়ী ১০০টিরও বেশি জেনেটিক ত্রুটি। 

পরিবেশগত কারণ বিদ্যমান থাকলে রোগের প্রকোপ বাড়তে পারে। যেমন—প্রতিনিয়ত রং ও সংরক্ষণের কেমিক্যালযুক্ত ফাস্ট ফুড খেলে, কিছু ওষুধের প্রভাবে বা ভারী ধাতুর সংস্পর্শেও অটিজমের প্রকোপ বাড়তে পারে। কারণ এসব শরীরে প্রবেশ করে কিছু জিনের কার্যক্ষমতা কমিয়ে দেয়। কথা বলতে শেখার সময় একাধিক ভাষার সম্মুখীন হলে, শিশুর বিকাশের উপযুক্ত সময়ে স্মার্টফোন বা ট্যাব নিয়ে খেলা করলে বা শিশুর মস্তিষ্ক বিকাশের জন্য উপযুক্ত উদ্দীপনা না পেলেও অটিজমের লক্ষণ বেড়ে যেতে পারে।

পরিসংখ্যান

অটিজম নিয়ে বাংলাদেশে তেমন পরিসংখ্যান নেই। তবে এ নিয়ে কর্মরত চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মতে, দেশে অটিজম রোগীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের চালানো ২০১৩ সালের এক গবেষণায় দেখা যায়, ঢাকায় শতকরা তিনজন শিশু অটিস্টিক। সেই তুলনায় গ্রামাঞ্চলে এই সংখ্যাাটি কম, ৭০০ জনে একজন। গবেষণাটি পরিচালনা করেন প্রখ্যাত শিশু নিউরোলজিস্ট ও বর্তমানে স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশন সদস্য অধ্যাপক ডা. নায়লা জামান খান। এক থেকে ৯ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে গবেষণাটি পরিচালিত হয়।

সারা দেশে ১৬ থেকে ৩০ মাস বয়সী শিশুদের মধ্যে ২০১৭ সালে বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব পেডিয়াট্রিক নিউরো ডিস-অর্ডার অ্যান্ড অটিজম (ইপনা) পরিচালনা করে এক গবেষণা। এতে জানা যায়, শহরের ছেলে শিশুরা অটিজমে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে এবং ৩০ মাসের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে অটিজমের হার মাত্র এক হাজার শিশুর মধ্যে ১৭ জন।

অটিস্টিক শিশুদের মধ্যে আরো কিছু গবেষণায় দেখা গেছে যে তাদের মধ্যে ঘুমের সমস্যা স্বাভাবিক শিশুদের তুলনায় বেশি। গভীর রাত পর্যন্ত জেগে থাকে তারা। কিছু জেনেটিক সিনড্রোম, যেমন—ডাউন সিনড্রোমের সঙ্গেও অটিজমের প্রকোপ বাড়ে। এ ছাড়াও স্মার্টফোন ব্যবহারের সঙ্গে শিশুদের মধ্যে বাড়ছে অটিজমের তীব্রতা—এমনও বলছে কোনো কোনো গবেষণার ফলাফল।

অটিজম নিয়ে বাংলাদেশে কার্যক্রম

গত ১৫ বছরে বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে অটিজম নিয়ে জনসচেতনতা তৈরি হয়েছে। এর ফলে যেমন বেড়েছে অটিজম নিয়ে কাজে আগ্রহীর সংখ্যা, তেমনি হয়েছে অবকাঠামোগত উন্নয়ন। স্বাস্থ্য সেবাদানকারী ও অন্যদের প্রশিক্ষণের ফলে এই শিশুরা আর প্রয়োজনীয় সেবা ও রোগের সঠিক নির্ণয় সেবার বাইরে থাকছে না। এ বিষয়ে কাজের লক্ষ্যে গঠন করা হয়েছে নিউরোডেভেলপমেন্ট প্রতিবন্ধী সুরক্ষা ট্রাস্ট ও অটিজম এবং এনডিডি সমস্যা বিষয়ক সেল। এর ফলে ইপনা (বিএমইউ) এবং শিশু বিকাশ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি বেসরকারিভাবেও কাজ করছে বেশ কিছু সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান। 

ব্যবস্থাপনা

অটিজমকে নির্মূল করার ওষুধ এখনো আবিষ্কার হয়নি। তবে এর মাত্রা তথা মূল লক্ষণ কমিয়ে আনা ও এ শিশুদের জীবনযাপনের মান উন্নত করতে পারে এমন বেশ কিছু ওষুধ আছে। এই রোগের সঙ্গে অনেক ধরনের প্রতিবন্ধকতা থাকতে পারে, যেমন এডিএইচডি, লার্নিং ডিস-অ্যাবিলিটি, খিঁচুনির সমস্যা, হজমের সমস্যা, যা অটিজমের মাত্রাকে আরো অনেক গুণ বাড়িয়ে তুলতে পারে। এসব রোগের চিকিৎসার মাধ্যমে অটিজমেরও প্রকোপ অনেকাংশে কমানো যেতে পারে। তাই এর চিকিৎসায় বিভিন্ন ধরনের বিশেষজ্ঞদের সমন্বিত দলের প্রয়োজন। অটিজম ব্যবস্থাপনার মধ্যে আছে—

►  ব্যাবহারিক শিক্ষা।

►  স্পিচ অ্যান্ড ল্যাংগুয়েজ থেরাপি।

►  পড়ালেখার জন্য বিশেষ স্কুল।

অটিজম ব্যবস্থাপনায় কাজ করছে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে আছে—

►  ইনস্টিটিউট অব পেডিয়াট্রিক নিউরো ডিস-অর্ডার অ্যান্ড অটিজম (ইপনা) বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়, শাহবাগ, ঢাকা।

►  ঢাকা শিশু হাসপাতাল, ‘শিশু বিকাশ কেন্দ্র’, ঢাকা।

►  জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, শেরেবাংলানগর, ঢাকা।

►  জাতীয় নিউরো সায়েন্স ইনস্টিটিউট।

►  প্রয়াস, বিশেষায়িত স্কুল, ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট

  মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল-এর শিশু বিকাশ কেন্দ্র। 

►  সরকার অনুমোদিত বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা ও বিশেষায়িত স্কুল।

►  জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন।

অটিস্টিক শিশুরা আমাদের সমাজেরই অংশ। তাদের অধিকার ও মর্যাদা সুরক্ষায় বিশেষ চাহিদাকে ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করা অপরিহার্য।

লেখক : সাবেক চেয়ারম্যান

শিশু নিউরোলজি বিভাগ

বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।

সূত্র: দৈনিক কালের কণ্ঠ, 5 এপ্রিল 2025

‘অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন শিশুর অভিভাবকদের সচেতনতা জরুরি’

শিশুদের স্নায়ু বিকাশজনিত সমস্যাই হচ্ছে অটিজম; যেখানে শিশুর ভাষার সমস্যা, অন্য শিশুদের সঙ্গে মেলামেশা এবং আচরণের সমস্যা থাকতে পারে। অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন শিশুর প্রথম দিকের উপসর্গ হলো- শিশু কোনো কারণ ছাড়াই নিজে নিজে ঘুরে, কোনো বস্তুকে ঘুরায়, বস্তুর প্রতি মনোযোগ কমিয়ে দেয়, সে নিজের মতো করে চলতে পছন্দ করে, কখনো কখনো ১৮-১৯ মাসের দিকে শিশুর পূর্বের কথাগুলো কমে যায়।

স্পেশাল শিশুর অভিভাবকদের জন্য পরামর্শ হলো- চিকিৎসক যদি কোনো ওষুধের পরামর্শ দেন তাহলে নিয়ম অনুযায়ী নিয়মিত ওষুধ খাওয়ান, নিজে নিজে ওষুধ বন্ধ করবেন না। দিনে তিন থেকে চারবার থেরাপি দিন বা ব্যায়াম করান। দিনে তিন থেকে চারবার খাওয়ান। শিশুদের অতিরিক্ত মোবাইল ফোন, টিভি দেখা থেকে বিরত রাখুন। রাত্রের বেলায় পরিপূর্ণ ঘুম নিশ্চিত করুন। মনে রাখবেন, ঘুমের সমস্যা হলে কথা বলা এবং আচরণে সমস্যা দেখা দেয়।

বুধবার (৫ মার্চ) ইএমআই স্পেশাল স্কুল অ্যান্ড থেরাপি সেন্টার আয়োজিত এক জুম মিটিংয়ে অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পূর্ণ শিশুদের অভিভাবকদের উদ্দেশে এসব কথা বলেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অটিজম অ্যান্ড এনডিডি সেলের সাবেক পরিচালক এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিশু নিউরোলজি বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. গোপেন কুমার কুন্ডু। দেশের নানা প্রান্ত থেকে অভিভাবকরা এবং স্পেশাল স্কুলের শিক্ষকরা এতে অংশ নেন। অভিভাবকরা তাদের শিশুদের নানা সমস্যার বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি সরাসরি পরামর্শ দেন।

অধ্যাপক গোপেন কুমার কুন্ডু বলেন, ঘুমের সমস্যা, খিঁচুনি, অতি চঞ্চলতা ও অমনোযোগিতা, দাঁত কিরমির করা, আচরণে সমস্যা, হজমের সমস্যা বা কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা হলো অটিজম শিশুর আনুষঙ্গিক অসুবিধা। এগুলোর ব্যাপারে অভিভাবকদের খুব সচেতন থাকতে হবে।

তিনি আরও বলেন, অটিজম রয়েছে এমন শিশুদের ভাষা শিখতে সমস্যা হয়, শব্দ বা স্পর্শের প্রতি অতি সংবেদনশীলতা বা সংবেদনহীনতা থাকতে পারে, পাশাপাশি কখনো কখনো আচরণের সমস্যা দেখা দেয়। অনেকে নাম ধরে ডাকলে সাড়া দেয় না, চোখে চোখ রেখে তাকায় না; কারও কারও অটিজমের সঙ্গে অতিচঞ্চল অমনোযোগিতা (এডিএইচডি) বা খিঁচুনি থাকতে পারে।

অটিজমের ব্যবস্থাপনা হিসেবে তিনি স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপি, অকুপেশনাল থেরাপি প্রদান, খিঁচুনি ও চঞ্চলতার চিকিৎসা করা এবং কাউস্নেলিং হিসেবে স্পেশাল স্কুলিং, ইনক্লুসিভ স্কুলে ভর্তি করার পরামর্শ দেন।

গোপেন কুমার কুন্ডু বলেন, একটি শিশুর জন্মের ৩ বছরের মধ্যে অটিজমের লক্ষণ প্রকাশ পায়। প্রথম ১৮ মাস বয়স পর্যন্ত এটা বোঝা যায় না। ১৮ মাসের পর থেকে ৩ বছর বয়সের মধ্যে একটা শিশুর মধ্যে কিছু লক্ষণ দেখা যায়। প্রথম তিন বছর পর্যন্ত খেয়াল রাখতে হবে, আপনার শিশুর খিঁচুনি, কথা বলতে কোনো অসুবিধা বা রাত্রে ঘুমের কোনো অসুবিধা হচ্ছে কিনা। এসব সমস্যায় তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে যথাযথ ব্যবস্থা নিলে বেশ উন্নতি হয়। 

তিনি আরও বলেন, যদি কোন শিশুর মস্তিষ্কের অসুবিধা থাকে তাহলে চোখ এবং কানের অসুবিধাও হতে পারে। এজন্য চোখ এবং কানের চিকিৎসাও করা জরুরি।

সূত্র: দৈনিক যুগান্তর, ০৫ মার্চ ২০২৫, ১০:৫৭ পিএম

”শিশুদের অটিজম ও স্নায়ু বিকাশজনিত সমস্যা”

”শিশুদের অটিজম ও স্নায়ু বিকাশজনিত সমস্যা” এই বইটি পড়লে এই সমস্যাগুলোর অনেক কিছু জানতে পারবেন। বর্তমানে নিরবে এই রোগটি বেড়ে যাচ্ছে। যা আমাদের সচেতনতাই পারে অনেকটা রোধ করতে।

বইটিতে যা যা রয়েছে–

** শিশুদের অটিজম সমস্যা

** শিশুদের এডিএইচডি বা অতি চঞ্চলতা সমস্যা

** শিশুদের দেরিতে কথা বলা সমস্যা

** শিশুদের খিঁচুনি রোগ ও মৃগীরোগ

** শিশুদের সেরিব্রাল পালসি সমস্যা

** শিশুদের বুদ্ধি প্রতিববন্ধিতা

** শিশুদের ডাউন সিনড্রোম সমস্যা

** ঝুঁকিপূর্ণ গর্ভবতী মা ও নবজাতক

** ইলেকট্রনিক ডিভাইস ও শিশুর বিকাশের সমস্যা

** বিশেষ শিশুর ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে রেসপাইট কেয়ার এর ভূমিকা

** শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশ এবং কিছু কথা

উপরের বিষয়গুলো আমাদের বাচ্চাদের সাথে হয়তো হচ্ছে কিন্তু আমরা তা বুঝতে পারছি না।

autism-book

শিশুর দেরিতে কথা বলার কারণ, কী করবেন

জেনে নিন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অটিজম অ্যান্ড এনডিডি সেলের পরিচালক এবং বিএসএমএমইউর শিশু নিউরোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. গোপেন কুমার কুন্ডুর কাছ থেকে।

শিশুর দেরিতে কথা বলা বাবা-মায়ের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। শিশুর দেরিতে কথা বলার কারণ কী এবং এ পরিস্থিতিতে কী করবেন জেনে নিন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অটিজম অ্যান্ড এনডিডি সেলের পরিচালক এবং বিএসএমএমইউর শিশু নিউরোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. গোপেন কুমার কুন্ডুর কাছ থেকে।  

শিশুর দেরিতে কথা বলার কারণ

ডা. গোপেন কুন্ডু বলেন, শিশুদের দেরিতে কথা বলার পেছনে বিভিন্ন কারণ রয়েছে। কিছু রোগের কারণে অনেক শিশু দেরিতে কথা বলে। যেমন-

১. ডাউন সিনড্রোম: ডাউন সিনড্রোমে শিশুর শরীর তুলতুলে নরম ও মুখমণ্ডলের ধরন আলাদা থাকে। এই শিশুদের বুদ্ধি হয় না, হাঁটা, বসা, চলাফেরা করতে পারে না এবং তারা কথাও দেরিতে বলে।

২. সেরিব্রাল পালসি: জন্মের সময় কান্না করতে দেরি হওয়ার কারণে মস্তিষ্কে অক্সিজেন কমে যায়, মস্তিষ্ক কাজ করে না। যার ফলে হাঁটা ও বসার মতো কথা বলাও দেরিতে হয়, শিশুর বুদ্ধি কমে যায়।

৩. অটিজম: এক্ষেত্রে হাঁটতে, বসতে বা চলতে অসুবিধা নেই, কিন্তু কথা বলতে দেরি হয়। আচরণগত অসুবিধা দেখা যায়। শিশু এক জায়গায় বসে থাকে না, নিজের মতো চলে। অন্য শিশুদের সঙ্গে মেশে না, কথা বলে না, কিছু আচরণ করে যা অন্য বাচ্চারা করে না।

৪. কনজেনিটাল বা জন্মগত হাইপোথাইরয়েডিজম: জন্মের পর যেসব শিশুর জিহ্বা বড় থাকে, জিহ্বা বের করে থাকে, পেট ফোলা থাকে, হাঁটতে ও বসতে দেরি করে সেসব বাচ্চার থাইরয়েড গ্ল্যান্ডের সমস্যা থাকে। হরমোনজনিত সমস্যার কারণে বাচ্চা দেরিতে কথা বলে।

৫. জন্মগতভাবে শিশু যদি কানে কম শোনে, কাছ থেকে ডাকলেও সাড়া না দেয়, এমন শিশুদের কথা বলতে দেরি হয়।

৬. শিশুর জিহ্বা যদি তালুর সঙ্গে লাগানো থাকে।

৭. শিশুর ঠোঁট কাটা, তালু কাটা থাকলে কথা বলা দেরি হতে পারে।

ডা. গোপেন কুন্ডু বলেন, এগুলো ছাড়াও পরিবেশগত কিছু কারণে শিশুর কথা বলতে দেরি হয়। যেমন-

১. দেরিতে কথা বলা বা কথা কম বলার পেছনে মোবাইল ফোন দায়ী। এক বছর বয়সে অনেক শিশু কথা বলা শিখতে শুরু করার পর দেখা গেছে দুই বছর বয়সে এসে তা কমে যাচ্ছে। এর কারণ শিশুর ওপর মোবাইল ফোনের প্রভাব।

২. গ্রামের তুলনায় শহড়ের শিশুরা দেরিতে কথা বলে। গ্রামের শিশুরা বাবা-মাকে বেশি পাশে পায়, অন্য বাচ্চাদের সঙ্গে মেশে, মোবাইল ফোন বেশি হাতে পায় না।

৩. শিশুর সঙ্গে বাবা-মায়ের কম কথা বলাও শিশুর দেরিতে কথা বলার কারণ। ছোট পরিবারের শিশুরাও দেরিতে কথা বলে।

৪.  বাবা-মা কর্মজীবী হলে সন্তানদের কম কথা বা দেরিতে কথা বলতে দেখা যায়।

৫. প্রবাসী বাঙালি যারা তাদের শিশুরাও অনেকে দেরিতে কথা বলে। জন্মের পর মাল্টিপল ল্যাঙ্গুয়েজের কারণে অনেক সময় শিশু কম কথা বলে, দেরিতে কথা বলে।

৬. মোবাইল ফোন, টেলিভিশন, ইউটিউবে মাল্টিপল ল্যাঙ্গুয়েজ শিশুদের দেরিতে কথা বলার কারণ।

শিশু দেরিতে কথা বলছে কি না কীভাবে বুঝবেন?

৬ মাসের একটি শিশু বাবলিং সাউন্ড করে।

১ বছরের শিশু বাবাকে বাবা ও মাকে মা বলতে শিখে।

২ বছরের শিশু দুইটা শব্দ একসঙ্গে করে ছোট বাক্য ‘আমি খাব’, ‘আমি যাব’ এসব বলতে পারে।

৩ বছরের শিশু বড় বাক্য তৈরি করে কথা বলতে পারে, ছড়া বলতে পারে।

ডা. গোপেন কুন্ডু বলেন, ৩ বছর বয়সের মধ্যে সব শিশু সব কথা বলতে পারবে এটা স্বাভাবিক। যদি কোনো শিশু তিন বছরের মধ্যে কথা না বলে তাহলে বুঝতে হবে তার কোথাও কোনো অসুবিধে আছে।

শিশুর দেরিতে কথা বলা সমাধানে কী করবেন

ডা. গোপেন কুন্ডু বলেন, শিশুর প্রথম তিন বছর বয়সেই বাবা-মা অভিভাবকদের খেয়াল করতে হবে শিশুর কথা বলায় দেরি হচ্ছে কি না। তিন বছর বয়সেই শিশু সব শিখে যায়। শিশু এক বা দুই বছরে যেসব শব্দ বলার কথা ছিল তা যদি না বলে তাহলে যত দ্রুত সম্ভব শিশু নিউরোলজিস্ট বা শিশু বিশেষজ্ঞের কাছে যেতে হবে।

তিন বছরের মধ্যে বিশেষজ্ঞের কাছে গেলে শিশুর সমস্যা শনাক্ত করে সঠিক ব্যবস্থাপনা ও চিকিৎসায় কথা বলার ব্যবস্থা করা সম্ভব। তিন বছর পর শিশুর কথা আসতে চায় না। কথা বলার জন্য শিশুর প্রথম তিন বছর খুব গুরুত্বপূর্ণ।

এ ছাড়া সরকারিভাবে জেলা হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজগুলোতে ৩৪টি শিশু বিকাশ কেন্দ্র রয়েছে। সেখানে চিকিৎসা নিতে পারবেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতাল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ইনস্টিটিউট অব নিউরোডিজিজ অ্যান্ড অটিজম (ইপনা) নামে একটি সেন্টার রয়েছে। সেখানেও দেরিতে কথা বলা শিশুদের চিকিৎসা দেওয়া হয়।

রোগ নাকি পরিবেশগত কারণে শিশু কথা দেরিতে বলছে সেটি শনাক্ত করে সেই অনুযায়ী চিকিৎসা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী স্পিচ থেরাপি দিতে হবে।

অন্য শিশুদের তুলনায় আপনার শিশু পিছিয়ে আছে কি না সেটি খেয়াল রাখতে হবে।

প্রথম ৩ বছর বয়সে শিশুর মস্তিষ্কের সর্বোচ্চ বিকাশ হয়, পরবর্তী ৫ বছর বয়স পর্যন্ত তা চলতে থাকে। শিশুর বিকাশের সময় মোবাইল ফোন দেওয়া উচিত নয় কোনোভাবেই। বাবা দেরিতে কথা বলেছে বলে সন্তান দেরিতে কথা বলছে, অগ্রজিহ্বা বা আলজিহ্বা বড় তাই কথা দেরিতে বলছে এরকম ভ্রান্ত ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে সঠিক সময়ে শিশুর চিকিৎসা নিশ্চিত করার পরামর্শ দেন ডা. গোপেন কুন্ডু।

সূত্র: The Daily Star

ইলেকট্রনিক ডিভাইস আসক্তি: শিশুর দেরিতে কথা বলার অন্যতম কারণ

অভিভাবকের সময়স্বল্পতায় শিশুকে ব্যস্ত রাখতে সহজ সমাধান হিসেবে এসব ডিভাইসকে বেছে নেওয়া হয় অধিকাংশ পরিবারে। কিন্তু এই সহজ সমাধান কঠিন সমস্যা হিসেবে ধরা পড়ে অল্প কিছুদিনের মধ্যেই। মোবাইল ফোনের মতো ইলেকট্রনিক ডিভাইসে আসক্তির কারণে ধীরে ধীরে শিশু হয়ে ওঠে অন্যমনস্ক। সরাসরি কারো সঙ্গে কথা বলতে চায় না সে, অন্য কোনো খেলাধুলায় আগ্রহী হয় না, সময়মতো ঘুমাতেও চায় না। একপর্যায়ে পুরোপুরিই কথা বলা বন্ধ করে দিতে পারে শিশু।

ইলাস্ট্রেশন: রাজিব রাজু

ঢাকার উত্তরার বাসিন্দা রাখি-মাসুদ দম্পতির একমাত্র সন্তান জাবিরের বয়স তখন দেড় বছর। সারাদিন তার চোখ আটকে থাকে মোবাইল স্ক্রিনে। কখনো ভিনদেশি কার্টুন আবার কখনো মোবাইল গেমস নিয়েই ঘরের এক কোণে নিশ্চুপ বসে থাকে জাবির। কেউ ডাকলে জবাব নেই কোনো, কারো সঙ্গে কথা বলায় নেই কোনো আগ্রহ। অথচ সাত মাস বয়স থেকেই ‘মা’, ‘বাবা’র মতো শব্দ উচ্চারণ করতে শিখেছিল সে। দিন দিন যেন কথা বলতে ভুলে গেছে জাবির।

দুশ্চিন্তাগ্রস্ত মা-বাবা তখন তাকে নিয়ে যান শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের শিশু বিকাশ কেন্দ্রে। কেস হিস্ট্রি শুনে, বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষা শেষে ডাক্তার জানালেন সবার আগে ইলেকট্রনিক ডিভাইস থেকে দূরে সরাতে হবে জাবিরকে। মোবাইল-ট্যাব-ল্যাপটপ সবচেয়ে বড় শত্রু তার।

ডাক্তারের পরামর্শ মেনে স্পিচ থেরাপি, ব্যায়াম, মা-বাবার সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ আর পরিচর্যায় পরবর্তী তিন বছরে অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে আসে জাবিরের কথা বলা আর আচার-আচরণ। এই দম্পতির পরবর্তী সন্তান জন্মের পর থেকেই তাই অতিরিক্ত সচেতন ছিলেন ইলেকট্রনিক ডিভাইস নিয়ে।

বর্তমানে অভিভাবকদের অন্যতম দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে শিশুর কথা বলতে দেরি হওয়া। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিশু নিউরোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা: গোপেন কুমার কুন্ডুর ভাষ্যে, “সাধারণত শিশুরা চার থেকে ছয় মাস বয়সের মধ্যে ‘মামা-বাবা’র মতো বাবলিং সাউন্ড করে, এক বছরে এক-দুইটা করে অর্থবহ শব্দ বলতে শেখে, দুই বছরে ছোট ছোট বাক্য গঠন করতে পারে, তিন বছরে ছড়া বলতে শেখে, এর কোথাও ব্যত্যয় ঘটলে মা-বাবাকে বুঝে নিতে হবে শিশুর বিকাশে সমস্যা হচ্ছে। সম্প্রতি আমাদের কাছে চিকিৎসা নিতে আসা শিশুদের মধ্যে কথা বলতে সমস্যা হওয়ার ঘটনা খুব সাধারণ।”

বিশেষজ্ঞ এই ডাক্তারের মতে, শিশুদের কথা বলতে দেরি হওয়ার পেছনে মূলত দুই ধরনের কারণ থাকতে পারে। প্রথমটি জেনেটিক, দ্বিতীয়টি পরিবেশগত। ইলেকট্রনিক ডিভাইসের প্রভাব শিশুর বিকাশে বিঘ্ন ঘটার পরিবেশগত কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম।

সহজ সমাধান যখন বিপদের কারণ

শিশুর এক বছর পূর্ণ হওয়ার পরপরই সাধারণত বাবা-মায়েরা তাকে মোবাইল বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক ডিভাইস দিয়ে দেয়, দীর্ঘদিনের চিকিৎসার অভিজ্ঞতা থেকে জানান ডাক্তার গোপেন কুমার। অভিভাবকের সময় স্বল্পতায় শিশুকে ব্যস্ত রাখতে সহজ সমাধান হিসেবেই এসব ডিভাইসকে বেছে নেওয়া হয় অধিকাংশ পরিবারে। কিন্তু এই সহজ সমাধান কঠিন সমস্যা হিসেবে ধরা পড়ে অল্প কিছুদিনের মধ্যেই।

মোবাইল ফোনের মতো ইলেকট্রনিক ডিভাইসে আসক্তির কারণে ধীরে ধীরে শিশু হয়ে ওঠে অন্যমনস্ক। সরাসরি কারো সঙ্গে কথা বলতে চায় না সে, অন্য কোনো খেলাধুলায় আগ্রহী হয় না, সময়মতো ঘুমাতেও চায় না। একপর্যায়ে পুরোপুরিই কথা বলা বন্ধ করে দিতে পারে শিশু। 

মোবাইলে হিন্দি-ইংরেজি নানান ভাষার কার্টুন দেখতে দেখতে কখনো কখনো নিজের বানানো অর্থহীন শব্দে কথা বলার চেষ্টাও করতে পারে সে। এছাড়াও চোখ শুষ্ক হয়ে যাওয়া, দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়া, ঘাড় ব্যথা, মাথা ব্যথার মতো নানা শারীরিক সমস্যারও শিকার হয় শিশু। ডিভাইসের প্রতি আসক্তি থেকে ‘স্ক্রিন ডিপেন্ডেন্সি ডিজঅর্ডারে’ও ভুগতে শুরু করে শিশু।

সময় থাকতে হতে হবে সচেতন

শিশুর মানসিক বিকাশের জন্য প্রথম পাঁচ বছর বয়সকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় বলে মনে করা হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে বাচ্চার মস্তিষ্কের ৮০ শতাংশ বিকাশ ঘটে তিন বছর বয়স পর্যন্ত। বাকি ২০ শতাংশ বিকাশ ঘটে তিন থেকে পাঁচ বছর বয়সে। তাই এই বয়সেই শিশুদের দিকে সর্বোচ্চ খেয়াল রাখতে হয় বাবা-মায়ের।

ডা: গোপেন কুমার কুন্ডু বলেন, “প্রথম তিন বছর বয়সটা শিশুদের বিকাশের জন্য ‘গোল্ডেন উইন্ডো পিরিয়ড’ হিসেবে ধরা হয়। এই সময়ে শিশু যে পরিবেশে বড় হবে সেটা তার সারাজীবনের উপর প্রভাব ফেলবে। এই সময়টায় কোনো কারণে শিশুর ব্রেনের বিকাশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা সারিয়ে তোলা কষ্টকর।”

শিশুর এই বিকাশকালীন সময়ে কোনো সমস্যা খেয়াল করলে দেরি না করে সাথে সাথেই বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়ার কথা বলেন এই চিকিৎসক। শিশুর কথা বলতে না চাওয়া, ইলেকট্রনিক ডিভাইসে আসক্তি, ঘুম কম হওয়া ইত্যাদি লক্ষণ দেখলে জানাতে হবে ডাক্তারকে।

‘আমাদের কাছে সাধারণত দুই-তিন বছর বয়সী বাচ্চাদের নিয়ে মা-বাবারা বেশি আসেন। দুই বছর বয়স বা তার আগে বাচ্চাকে নিয়ে এলে আমরা একটু বেশি সময় পাই সাহায্য করার। পাঁচ বছর বয়স পর্যন্ত বাচ্চার ব্রেইনের নিউরনের বিকাশ ঘটানোর জন্য আমরা চেষ্টা করতে পারি বিভিন্ন থেরাপি দিয়ে। কিন্তু যদি কোনো বাচ্চাকে পাঁচ বছর বয়সের পর নিয়ে আসা হয় তাহলে নিউরনের বিকাশের আর সময় থাকে না,’ বলেন ডা: গোপেন কুমার।

শিশুর কোনো জেনেটিক জটিলতা না থাকলে সময়মতো চিকিৎসা গ্রহণ করে অনেকাংশেই সারিয়ে তোলা যায় কথা না বলার সমস্যা। চিকিৎসার জন্য সহায়তা করতে পারেন শিশু নিউরোলজিস্ট বা সাইকিয়াট্রিস্ট্ররা। এছাড়া নির্দিষ্ট সরকারি হাসপাতালের শিশু বিকাশ কেন্দ্রেও সহজে পাওয়া যাবে চিকিৎসা।

বড় দায়িত্ব বাবা-মায়ের

ইলেকট্রনিক ডিভাইস যেন শিশুর বিকাশে বাধা হয়ে না দাঁড়াতে পারে সেজন্য সবচেয়ে বেশি তৎপর হতে হবে শিশুর বাবা-মাকে। শুরু থেকেই শিশুকে একান্ত সময় দেওয়া, তার সঙ্গে সারাক্ষণ কথা বলা, অন্যান্য শিশুর সঙ্গে খেলতে নিয়ে যাওয়া- ইত্যাদির অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে তাদের। অভিভাবকেরা উভয়ই কর্মজীবী হলে দুজনে সময় ভাগাভাগি করে শিশুকে সঙ্গ দিতে হবে। শিশুর মঙ্গলের জন্য জীবনযাপন পদ্ধতিতে আনতে হবে পরিবর্তন।

ডাক্তার গোপেন কুমারের পরামর্শ অনুযায়ী, বাচ্চার ঘুমের সময় ঠিক রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ডিভাইসে আসক্তির কারণে অনেক সময় শিশুর ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে। ঘুমের অভ্যাস ঠিক করতে শোবার ঘরে উপযুক্ত পরিবেশ রাখতে হবে। শোবার ঘরে টিভি থাকলে তা সরিয়ে ফেলতে হবে।

শিশুর কথা বলা শেখার সময়টায় যেকোনো একটি ভাষায় তার সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন চিকিৎসকেরা। ‘বাচ্চা যখন তার আশেপাশে কয়েকটি ভাষায় কথা শুনতে পায় তখন সে বুঝতে পারে না কোন ভাষায় কথা বলবে। এ কারণে মাতৃভাষা বা যে ভাষায় আশেপাশের মানুষজন কথা বলছে কেবল সে ভাষাতেই শিশুর সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। কার্টুন বা অন্য কোনো অনুষ্ঠান দেখলেও তা হতে হবে একই ভাষায়। নয়তো শিশুর কথা শিখতে সমস্যা হয় খুব,’ বলেন শিশু নিউরোলজিস্ট গোপেন কুমার কুন্ডু।

ইলেকট্রনিক ডিভাইস দিতে মানতে হবে নিয়মাবলি

প্রযুক্তি বিপ্লবের এই যুগে নতুন প্রজন্মের শিশুকে ইলেকট্রনিক ডিভাইস থেকে পুরোপুরি দূরে সরিয়ে রাখার কোনো উপায় নেই। শিশুর বিকাশকে বাধাগ্রস্ত না করতে চাইলে কিছু নিয়ম মেনে তাকে মোবাইল বা অন্যান্য ইলেকট্রনিক ডিভাইস দেওয়ার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা। যেমন:

·       তিন বছর পূর্ণ হওয়ার পর মোবাইল-ট্যাবের মতো ইলেকট্রনিক ডিভাইস দেওয়া যেতে পারে শিশুকে।
·       অভিভাবকের তত্ত্বাবধানে দিনে ঘণ্টাখানেকের জন্য এসব ডিভাইস ব্যবহার করতে পারবে শিশু।
·       দেখতে হবে শিক্ষণীয় প্রোগ্রাম।
·       ঘুমের আগে দেওয়া যাবে না ইলেকট্রনিক ডিভাইস

সূত্র: tbsnews.net

আজ ২ এপ্রিল বিশ্ব অটিজম দিবস

অটিজম ও বাংলাদেশ

আজ বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য—‘এমন বিশ্ব গড়ি, অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন ব্যক্তির প্রতিভা বিকশিত করি’। অটিজম নিয়ে লিখেছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিশু নিউরোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. গোপেন কুমার কুন্ডু

অটিজম হচ্ছে শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশজনিত সমস্যা, যেখানে শিশুদের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ, সামাজিক আচরণ, সামাজিক কল্পনা ইত্যাদি ক্ষেত্রে বেশ সমস্যা লক্ষ করা যায়। বিশেষজ্ঞরা একে অটিজম স্পেকট্রাম ডিস-অর্ডার বলেও থাকেন।শিশুর জন্মের প্রথম তিন বছরের মধ্যে এর লক্ষণ প্রকাশ পায়। রবার্ট এল বার্কার উল্লেখ করেছেন, অটিজম এমন একটি বিকাশজনিত সমস্যা, এতে ব্যক্তির মধ্যে বাইরের জগৎ সম্পর্কে অতি সামান্য আগ্রহ পরিলক্ষিত হয়।

প্রকৃতপক্ষে অটিজমে আক্রান্ত ব্যক্তির অন্য মানুষ বা বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্ক থাকে না বললেই চলে। বরং তার সব মনোযোগ যেন তার ইচ্ছা ও অনুভূতির মধ্যেই মগ্ন থাকে।অটিস্টিক শিশুর বিকাশ তিনটি ক্ষেত্রে বাধাগ্রস্ত হয়, যেমন—

সামাজিক সম্পর্ক স্থাপনে বাধা

অন্য কোনো ব্যক্তির প্রতি আগ্রহ না থাকা, কে কী করছে তা নিয়ে কৌতূহল না থাকা এবং অন্যের আচরণ বুঝতে না পারা।

যোগাযোগ স্থাপনে বাধা

মুখের ভাষায় কথা বলতে না শেখা, কিছু কথা বলতে পারলেও অন্যের সঙ্গে আলাপচারিতায় সমর্থ না হওয়া এবং ইশারা-ইঙ্গিত করতে না পারা।

আচরণের ভিন্নতা

পুনরাবৃত্তিমূলক আচরণ করা, একই কাজ বারবার করা এবং একই খেলা বারবার খেলা।

অটিস্টিক শিশুর অন্যান্য বৈশিষ্ট্য

অন্যের সঙ্গে যোগাযোগ ও আচরণের সীমাবদ্ধতা হচ্ছে অটিস্টিক শিশুর প্রধান বৈশিষ্ট্য। এ ছাড়া উল্লেখযোগ্য আরো বৈশিষ্ট্য হলো—

♦ নাম ধরে ডাকলে সাড়া দেয় না।

♦ কোনো খেলনা বা আনন্দদায়ক বস্তুর প্রতি আকৃষ্ট হয় না বা আঙুল দিয়ে ইশারা না করা বিশেষ আচরণ বারবার করতে চায়, যেমন—বারবার হাত নাড়ানো।

 কোনো বিশেষ বস্তুর প্রতি অতিমাত্রায় আসক্তি থাকা।

♦ ভাষার ব্যবহার রপ্ত করার পর আবার তা ভুলে যাওয়া।

♦ অতিরিক্ত রুটিন মেনে চলা।

অটিজমের কারণ

অটিজমের সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ এখন পর্যন্ত নির্ণয় করা না গেলেও কোনো কোনো বিজ্ঞানী মনে করেন, অটিজমের পেছনে দুটি কারণ রয়েছে—জিনগত সমস্যা এবং পরিবেশগত সমস্যা। অটিজমে আক্রান্ত শিশুর ডিএনএ কপি নাম্বার ভেরিয়েন্ট নামক ত্রুটি বহন করে।

পরিবেশের বিষাক্ত উপকরণ জিনের ওপর কাজ করে স্নায়ুকোষ ধ্বংস করে। এই বিষাক্ত উপাদান গর্ভের শিশু এবং শিশুর বৃদ্ধির প্রাথমিক পর্যায়ের মস্তিষ্কের কোষকে ধ্বংস করে। যেসব রাসায়নিক দ্রব্য অটিজমের জন্য দায়ী বলে ধারণা করা হয় তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে মার্কারি, লেড, পোকা-মাকড় মারার বিষ, খাদ্য সংরক্ষণ করার রাসায়নিক দ্রব্য, খাদ্য সৌন্দর্য বৃদ্ধির কৃত্রিম রং ইত্যাদি। কখনো কখনো পরীক্ষা-নিরীক্ষায় মস্তিষ্কের কিছু অসুবিধা লক্ষ করা যায়, যেমন—

♦ মস্তিষ্কের অস্বাভাবিক বৈদ্যুতিক ক্রিয়া।

♦ মস্তিষ্কের নিউরোকেমিক্যালের অসামঞ্জস্যতা।

♦ শিশুর জন্ম-পূর্ব বা জন্ম-পরবর্তী কালের কোনোরূপ সংক্রমণ।

♦ মস্তিষ্কের গঠনগত ত্রুটি।

বাংলাদেশের অটিজমের অবস্থা

বিশেষজ্ঞের মতে, বাংলাদেশে অটিস্টিক শিশুর সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে চলেছে। ১৯৮০ সালে প্রতি দুই হাজার ৫০০ জনে একজন ছিল অটিস্টিক এবং ২০১০ সালে ছিল ১১০ জনে একজন অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন শিশু। বর্তমানে ৫৪ জনে একজন (সিডিসি, ২০১৮ থেকে)। সমাজসেবা অধিদপ্তরের প্রতিবন্ধী শনাক্তকরণ জরিপে (২০২০-২১) বর্তমানে বাংলাদেশে অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন শিশুর সংখ্যা প্রায় ৬১ হাজার। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অন্য একটি জরিপে (২০১৩ সাল) বলা হয়েছে, ঢাকা শহরে অটিস্টিক শিশুর সংখ্যা গ্রামাঞ্চলের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি। সম্প্রতি ঢাকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ইনস্টিটিউট অব পেডিয়াট্রিক নিউরোডিস-অর্ডার অ্যান্ড অটিজম (ইপনা)’-এর এক গবেষণায় বাংলাদেশে তিন বছরের নিচের শিশুদের অটিজমের হার ১০ হাজার জনে ১৭ জন।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সরকারি মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালগুলোতে ৩৪টি শিশু বিকাশ কেন্দ্র রয়েছে। দেশের সব জেলার প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্রে একটি করে অটিজম কর্নার (১০৭টি) স্থাপিত হয়েছে। এ ছাড়া কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংস্থা, স্বায়ত্তশাসিত এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও অটিজম রোগীদের কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছে। তবে প্রয়োজনের তুলনায় এগুলোর সংখ্যা খুবই কম।

অটিজম শিশুর ব্যবস্থাপনা

গবেষণায় দেখা গেছে, শৈশবে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া গেলে অটিজম নিয়ে জন্ম নেওয়া শিশু প্রাপ্তবয়সে অনেকটাই স্বাভাবিক হতে পারে। শৈশবে নেওয়া পদক্ষেপ বলতে বোঝায় জন্মের ১৮ থেকে ৩৬ মাস বয়সের মধ্যে অটিজম শনাক্তকরণ ও ব্যক্তিগত পর্যায়ে শিক্ষা পরিকল্পনার মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে শিশুকে সঠিক চিকিত্সা দেওয়া। অটিস্টিক শিশুর প্রধান চিকিত্সা স্পিচ থেরাপি, নিউরোবিহেভিওরাল থেরাপি। অতিরিক্ত আচরণগত সমস্যা, ঘুমের সমস্যা ও শারীরিক সমস্যার জন্য মেডিক্যাল চিকিত্সা এবং বিশেষ স্কুলে শিক্ষা দেওয়া যেতে পারে।

আমাদের করণীয়

কোনো শিশুর মধ্যে যদি অটিজমের কোনো বৈশিষ্ট্য ১২ থেকে ১৮ মাসের মধ্যে তার মা-বাবা লক্ষ করে থাকেন, তাহলে প্রথমে অবশ্যই অতি দ্রুত শিশুকে একজন বিশেষজ্ঞ চিকিত্সককে দেখানো উচিত। জেনে রাখা ভালো যে বেশির ভাগ অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন শিশু অত্যন্ত সম্ভাবনাময় হয়। প্রতি ১০ জনে একটি অটিস্টিক শিশুর মধ্যে ছবি আঁকায়, গানে, গণিতে বা কম্পিউটারে প্রচণ্ড দক্ষতা থাকে। তাই এই বিশেষ শিশুকে ঠিকমতো পরিচর্যা করে সমাজে অন্যান্য শিশুর কাছাকাছি করে গড়ে তুলতে পারলে আমাদের দেশব্যাপী এ আন্দোলনে আমরা জয়ী হব।

সূত্র: দৈনিক কালের কণ্ঠ

ঘরবন্দি শিশুমনে আসবে প্রশান্তি

সারাদেশের প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক স্তরের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের পাঠদান শুরু হচ্ছে আজ। করোনা মহামারীর কারণে দেড় বছর বন্ধ থাকার পর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলায় মানসিকভাবে উৎফুল্ল হয়ে উঠেছে শিক্ষার্থীরা। দীর্ঘদিনের বন্দিদশা থেকে যেন মুক্তি মিলছে। বন্দি থাকার কারণে যেসব শিশু মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছিল, স্কুল খোলায় তাদের এ সমস্যার দ্রুত সমাধান হবে। এমনকি অনেক শিশু ইলেকট্রনিক্স ডিভাইসে আশক্ত হয়ে পড়েছিল। স্কুল খোলায় সেই সমস্যারও সমাধান হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে শিক্ষকরা যেন অনেক পড়া অল্প সময়ে শেষ করতে চাপ না দেন সেদিকেও লক্ষ্য রাখতে পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) মনরোগ বিদ্যা বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সালাহউদ্দিন কাউসার বিপ্লব আমাদের সময়কে বলেন, স্কুল বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ যেন অতিউৎসাহী হয়ে না পড়ে। অনেক দিন পর স্কুল খুলছে, অনেক লেখাপড়া বাকি, তাই বেশি বেশি পড়ে সব দ্রুত শেষ করতে হবে। শিক্ষকরা যেন এমন আচরণ না করেন। কারণ এমনটি করলে শিশুদের মানসিক চাপ বাড়বে। এতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলায় যে উপকার হওয়ার কথা, তার চেয়ে ক্ষতিই বেশি হবে। বলা যায় হিতে বিপরীত হবে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, সরকারিভাবে স্কুলগুলোতে ইউনিসেফের সহায়তায় তৈরি করা একটি নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে- শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অবস্থানের সময় শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং কর্মকর্তা-কর্মচারী সবাইকে সব সময় মাস্ক পরতে হবে। এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের তিন ফুট শারীরিক দূরত্বে রাখা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিদিন নিয়মিত পরিষ্কার ও জীবাণুমুক্ত করার কথা আছে। নির্দেশনা অনুযায়ী শ্রেণিকক্ষে ৫ ফুটের চেয়ে ছোট আকারের বেঞ্চিতে একজন ও এর চেয়ে বড় আকারের বেঞ্চিতে দুজন শিক্ষার্থী বসানো যাবে। কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রথম দিকে পাবলিক পরীক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীরাই বেশি আসবে। বাকিদের স্কুলে আসার জন্য রোটেশন সিস্টেম অর্থাৎ আজ যারা আসবে তারা কাল আসবে না- এ নীতি অনুসরণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

বিএসএমএমইউর শিশু নিউরোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. গোপেন কুমার কুণ্ডু বলেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার সিদ্ধান্ত শিশুদের জন্য ইতিবাচক। কারণ এক বছরেরও বেশি সময় তারা ঘরবন্দি হয়ে আছে। এ সময়ে অনেক শিশু বিভিন্ন ধরনের ইলেকট্রনিক্স ডিভাইসের ওপর আশক্ত হয়ে পড়েছে। অনেকে বাসায় বন্দি থেকে মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। এমনকি মনের কোণে লুকিয়ে থাকা অনেক কথা যা তারা শুধু বন্ধুদের সঙ্গে আলোচনা করে, সেগুলো কারও সঙ্গে আলোচনা করতে না পেরে মানসিক অশান্তিতে ছিল। স্কুল বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলায় শিশুদের এ মানসিক সমস্যা ও অস্থিরতা দূর হবে। তবে অসুবিধাও রয়েছে। সেটি হলো- করোনাকালীন স্কুলের পরিবেশ ঠিক রাখতে হবে। বিশেষ করে স্কুলে মাস্ক পরা, হাত ধোয়া বা সেনিটাইজারের ব্যবস্থা করা। মনে রাখতে হবে, শিক্ষকরা টিকা নিয়ে থাকলেও শিশুরা এখনো টিকা পায়নি। তাই তাদের স্বাস্থ্যবিধির ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। শিশুদের স্কুলে পাঠিয়ে পিতা-মাতা যেন দুশ্চিন্তায় না পড়ে, সে জন্য তাদের কাউন্সেলিং করতে হবে।

গত বছর মার্চে বাংলাদেশে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ শুরুর পর থেকে স্কুল-কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে সশরীরে বা সরাসরি ক্লাস বন্ধ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে কয়েক দফা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার কথা বলা হলেও শেষ পর্যন্ত কোভিড সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে না আসায় ছুটি ১১ সেপ্টেম্ব^র পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছিল। এখনো সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে না এলেও ব্যাপক টিকাদান কর্মসূচির পাশাপাশি সংক্রমণের হার কমে আসায় কোভিড কারিগরি পরামর্শক কমিটির সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার কথা জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি।

* মনের কোণে লুকিয়ে থাকা কথা কারও সঙ্গে আলোচনা করতে না পেরে মানসিক অশান্তিতে ছিল। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলায় শিক্ষার্থীদের এমন মানসিক সমস্যা ও অস্থিরতা দূর হবে -ডা. গোপেন কুমার কুণ্ডু অধ্যাপক, বিএসএমএমইউ

* অনেক দিন পর স্কুল খুলছে, অনেক পড়া বাকি। বেশি বেশি পড়ে সব দ্রুত শেষ করতে হবে… শিক্ষকরা যেন এমন আচরণ না করেন -ডা. সালাউদ্দিন কাউসার অধ্যাপক, বিএসএমএমইউ

সূত্র: দৈনিক আমাদের সময়

করোনাকালীন অটিজম ও বিশেষ শিশুদের জন্য করণীয়

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী বিশ্বের প্রায় সকল দেশেই এই কোভিড-১৯ ছড়িয়ে পড়েছে। করোনাভাইরাস বড়দের পাশাপাশি শিশুদের মধ্যেও সংক্রমিত হচ্ছে এবং তা শিশুদের জীবনযাত্রাকে প্রভাবিত করছে। করোনার দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব থেকে দূরে রাখার জন্য স্বাভাবিক শিশুদের পাশাপাশি বিশেষ শিশুদেরও একটি রুটিন করুন। তাদের খাওয়া দাওয়া, খেলাধূলা, ঘুম ও শিক্ষাদীক্ষা একটি নির্দিষ্ট সময় অনুযায়ী চলতে অভ্যস্ত করুন।

কেমন হতে পারে সেই রুটিন?

বাড়িতে শিশুর খাবার-দাবার:

এসময় বিশেষ শিশুরা বাড়িতে তাদের পূর্বের স্বাভাবিক খাবার খাবে। তবে মাছ, মাংস, দুধ, ডিম ও ডাল প্রোটিন জাতীয় খাবার বেশি খাবে। তাতে তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে। সবুজ শাকসবজি-ফলমূল বেশি খাবে এবং তাদের ভিটামিনস ও মিনারেল যুক্ত খাবার বেশি খেলে তাদের ভাইরাসের আক্রমন থেকে রক্ষা পাবে। প্রচুর পরিমানে পানি খেতে হবে এসময়।

এছাড়াও, করোনাভাইরাস নাক ও মুখে দিয়ে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে এবং প্রথম ৩-৫ দিন তারা মানুষের গলায় সংক্রমিত হয়। এজন্য দিনে ৩-৫ বার গরম পানি লবন দিয়ে / লেবু চা এসময় বিশেষ শিশুর করোনা ভাইরাসের আক্রমন থেকে রক্ষা করবে।

বাড়িতে খেলাধূলা/সময় কাটানো:

করোনাকালীন সময়ে এই বিশেষ শিশুদের মধ্যে মানসিকভাবে একধরনের বিষণ্ণতা ও উদ্বিগ্নতা কাজ করবে। কারণ তারা অন্যদের সাথে খেলতে পারছে না। তাদের ভাবগুলোর আদান প্রদান করতে পারছে না। যদিও তাদের ভাবের বহিঃপ্রকাশটা অন্যদের মতো নয়, ভাব বিনিময় অন্যশিশুদের তুলনায় আলাদা।

সার্বক্ষণিক সঙ্গ দিন:

তাদেরকে সবসময় সঙ্গ দিন এবং তাদেরকে সময় দিন এবং বাড়ীর ছোট ছোট কাজে নিয়োজিত রাখুন। বাসায় সম্ভব হলে পাজল দিয়ে খেলা, বাবল্ ফুলানো খেলা, টুকি খেলা, পুতুল খেলা, চা বানানো খেলা ইত্যাদি খেলাগুলিতে নিয়োজিত রাখুন। আর এ সমস্ত খেলাতে পিতা-মাতা উভয়েই আপনার শিশুর সাথে খেলুন এবং শিশুর খেলাকে আরো আনন্দময় করুন।

বাসায় শিক্ষাদীক্ষা/পড়াশুনা:

যে সমস্ত বিশেষ শিশু নিয়মিত স্কুলে যেত, তাদের হঠাৎই স্কুল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শিশুর আচরণে পরিবর্তন আসতে পারে। আমরা জানি ওরা নির্দিষ্ট নিয়মের মধ্যে থাকতে চায় এবং রুটিন মেনে চলতে চায়। তাই এসময় শিশুর জন্য বাসায় স্কুল সময়ে একটি সেশনের আয়োজন করুন (১-২ ঘন্টা), সেটি হতে পারে সকালে ১০-১২টা বা ৯-১১ টায়। যেখানে স্কুলের সাথে মিল রেখে শিশুকে বয়স অনুযায়ী ছবি আঁকা শিখান, ছড়া শিখান, গল্প বলুন, ধর্মীয় বিধিবিধান শিখান, গান বা মিউজিক শিখান। এতে শিশু তার বিভিন্ন শিক্ষায় পারদর্শি হবে এবং তার সময়গুলি খুব ভাল কাটবে। স্কুল শিক্ষকের সাথে এসময় নিয়মিত পড়াশুনার ব্যাপারে যোগাযোগ রাখুন। 

বিশেষ শিশুর ঘুম:

আপনার বিশেষ শিশুর ঘুমের প্রতি বিশেষ নজর রাখুন। একটি কথা মনে রাখবেন, রাতের স্বাভাবিক ঘুম, দিনের আনন্দকে বাড়িয়ে দিবে অনেকগুন। করোনার এসময়ে শিশুর ও মানসিক উদ্বিগ্নতা ও উৎকন্ঠা থাকে ফলে রাতের ঘুমের ব্যঘাত হতে পারে। শিশুকে রাতে ৯-১০ টার মধ্যে বেডে শোয়ানোর অভ্যাস করুন। এসময় মোবাইল ও অন্যান্য ডিভাইস তার রাতের ঘুমের বাধাঁর কারণ হয়ে উঠতে পারে। সেদিকে খেয়াল করুন প্রয়োজন হলে তার স্বাভাবিক ঘুমের জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী তাকে মেলাটনিন জাতীয় ঔষধ ১/২ ট্যাবলেট খাওয়াতে পারেন।

বাহিরের খেলাধূলা:

৩-৪ মাস ধরেই এ শিশুরা বলতে গেলে ঘরবন্দি। তাদের স্বাভাবিক জীবন-যাপন ব্যহত, তাই করোনার এইসময়ে তাকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে খোলা মাঠে (যেখানে মানুষ কম) অথবা ছাদে বিকালে খেলাধুলা অথবা হালকা শারীরিক শরীর চর্চার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। তাতে শিশুর শরীর ও মনের অনেক পরিবর্তন আসতে পারে। খোলা মাঠ ও ছাদে নেওয়া না সম্ভব হলে , শিশুকে দিনের বেলায় ঘরের বারান্দাতে অথবা জানালার পাশে বসতে উৎসাহিত করুন।

শিশুর আচরণের প্রতি লক্ষ্য রাখুন:

এই সময়ে বিশেষ শিশুর আচরনের উপর মনোযোগ দিন। শিশুর হঠাৎ আচরনের পরিবর্তন দেখা গেলে, হঠাৎ অতিমাত্রায় চঞ্চলতা দেখা দিলে (হাইপার একটিভিটি) তার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিন এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। তবে খেয়াল রাখুন এই সময় শিশু যেন অতিমাএায় ডিভাইস নির্ভও না হয়ে পরে।

করোনা উপসর্গ দেখা দিলে করণীয়:

বিশেষ শিশুদের করোনার উপসর্গ অন্য শিশুদের মতোই। যেমন: জ্বর, হাঁচি, কাশি , গলা ব্যাথা ও শ্বাসকষ্ট ইত্যাদি। উপসর্গগুলো অন্যান্য শিশুদের মতো হলেও তাদের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি কারণ তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম এবং তারা নিজেদের পরিষ্কার-পরিছন্নতা নিজেরা রাখতে পারে না (অন্য শিশুদের তুলনায়)। করোনার উপসর্গ থাকলে যেমন: হালকা ঠাণ্ডা, কাশি, জ্বরের জন্য নাপা বা প্যারাসিটামল এবং এন্টি হিচটামিন জাতীয় ওষুধ খাওয়ানো যেতে পারে এবং জ্বরের জন্য গা স্পঞ্জিং করতে হবে। এছাড়াও, গলা ব্যাথা হলে লবন ও গরম পানি দিয়ে গড়গড়া করবে, গরম পানি খাবে, তুলসী পাতার রস খাওয়ানো যেতে পারে।

জ্বর যদি না কমে এবং রোগ বাড়তে থাকে তাহলে বিশেষজ্ঞ শিশু চিকিৎসক বা হাসপাতালে যোগাযোগ করবেন। তবে শিশুদের হাইপারএকটিভিটি ও অন্যান্য এর জন্য নির্ধারিত ঔষধ বন্ধ করার প্রয়োজন নাই।

শিশুর সুরক্ষার জন্য ব্যবস্থা:

শিশু বাইরে গেলে মাস্ক পরাবেন, দিনে ৩/৪ বার সাবান পানি দিয়ে (নিজে এবং শিশুকে), গরম পানি খাওয়াবেন কয়েক বার, বাসার খেলনাগুলি সপ্তাহে ২ বার পরিষ্কার করবেন, এসময় বাড়িতে অতিথি প্রবেশ না করানোই ভাল, প্রয়োজন ছাড়া বাড়ির বাইরে নিজে বা শিশু যাবে না। , যদি যান- শারীরিক দূরত ¡ মানা, মাস্ক ও হাঁচি কাশি সিষ্টাচার মানা, বাসায় ঢুকার পূর্ব মূহুর্তে এলকোহল যুক্ত হ্যান্ড সেনিটাইজার দ্বারা হাত সেনিটাইজ করুন, হাত সাবান দিয়ে ধুয়ে ফেলুন, সর্বোপরি গোসল ও কাপড় ধৌত করে তারপর আপনার প্রিয় শিশুকে স্পর্শ করুন।

সর্বোপরি, করোনাকালীন সময়ে অটিজম ও বিশেষ শিশুর প্রতি অধিক নজর রাখুন এবং নিয়মিত এ শিশুর চিকিৎসকের সাথে যোগাযোগ রাখুন।

ডা. গোপেন কুমার কুন্ডু, সাবেক চেয়ারম্যান, শিশু নিউরোলজি বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়

সূত্র: দৈনিক মেডি ভয়েস

শিশুর বিকাশে বাধা ইলেকট্রনিক যন্ত্র

বর্তমান বিশ্বে যোগাযোগের সবচেয়ে বড় মাধ্যম মুঠোফোন। এ ছাড়া এই যন্ত্র শিক্ষা ও গবেষণার কাজে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু আজকাল নিউক্লিয়ার ফ্যামিলির (ছোট পরিবার) বেশির ভাগ মা শিশুদের হাতে যন্ত্রটি দিয়ে নিজেদের কাজ করে থাকেন।

অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায়, মায়েরা শিশুকে খাওয়ানোর সময় মুঠোফোন ব্যবহার করেন। একসময় অভ্যাসটা এমন পর্যায়ে যায় যে এটি ছাড়া শিশুকে খাওয়ানো সম্ভব হয় না। এ ছাড়া দীর্ঘদিন মুঠোফোন ব্যবহার করলে তাদের কারও কারও মধ্যে ‘স্ক্রিন ডিপেনডেন্সি ডিজঅর্ডারস’ তৈরি হতে পারে।

স্ক্রিন ডিপেনডেন্সি ডিজঅর্ডারসে শিশুদের মধ্যে কিছু শারীরিক ও মানসিক সমস্যা দেখা দেয়। শারীরিক সমস্যা হচ্ছে ঘুমের অসুবিধা, পিঠ বা কোমরে ব্যথা, মাথাব্যথা, দৃষ্টিশক্তি হ্রাস, ওজন বৃদ্ধি, পুষ্টিহীনতা ইত্যাদি। কারও কারও মধ্যে আবেগময় উপসর্গ, যেমন উদ্বেগ, অসততা, একাকিত্ব, অপরাধবোধ ইত্যাদি হতে পারে। তারা বাইরে যেতে চায় না। দীর্ঘ সময় মুঠোফোন ব্যবহারের ফলে নানা মানসিক সমস্যা দেখা দেয়।

মুঠোফোন সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করে দুই থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুরা। একটি শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশের উপযুক্ত সময় প্রথম পাঁচ বছর। মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশ হচ্ছে কি না, কীভাবে বুঝবেন।

এক থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে শিশুর কথা বলতে শেখা, হাঁটাচলা শেখা এবং স্বাভাবিক বুদ্ধির বিকাশ হয়। তখন দীর্ঘ সময় মুঠোফোনে গেম খেলা, ইউটিউব দেখার ফলে স্বাভাবিক উদ্দীপনামূলক খেলাধুলা হয় না। এতে শিশুর স্নায়বিক বিকাশ ব্যাহত হয়। শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশ নির্ভর করে পরিবেশ ও অন্যান্য শিশুর সঙ্গে ভাবের আদান-প্রদানের ওপর। বলা হয়, শিশু দেখতে দেখতে এবং অন্যদের সঙ্গে খেলতে খেলতে শেখে।

শিশু বেশি সময় মুঠোফোনে থাকলে মা-বাবার সঙ্গে তার সামাজিক যোগাযোগ এবং সমবয়সী শিশুদের সঙ্গে মেলামেশা একেবারেই কমে যায়।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, অতিরিক্ত মুঠোফোন ও টিভি দেখলে পরবর্তী সময়ে শিশুদের মধ্যে অতিমাত্রায় চঞ্চলতা দেখা দিতে পারে, ঘুমের সময় কমে গেলে শিশুর বিকাশ ব্যাহত হতে পারে।

আমেরিকান একাডেমি অব পেডিয়াট্রিকস অ্যান্ড টেলিভিশন কমিটি শিশুদের ইলেকট্রনিক মিডিয়া ব্যবহারের ক্ষেত্রে কয়েকটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যেমন—

  • দুই থেকে পাঁচ বয়সের শিশুরা সারা দিনে এক থেকে দুই ঘণ্টা স্ক্রিন দেখতে পারবে। তা–ও সেটি মানসম্পন্ন অনুষ্ঠান হতে হবে।
  • দুই বছরের কম বয়সী শিশুদের হাতে মুঠোফোন না দেওয়া ভালো।
  • শিশুদের শোবার কক্ষ থেকে টেলিভিশন সরিয়ে ফেলা উচিত।
  • শিশুদের বিকাশের ক্ষেত্রে কিছু উদ্দীপনা দিতে হবে, যেমন শিশুর সঙ্গে কথা বলা, গল্প করা, ছড়া বলা, গান করা ইত্যাদি।

অতিরিক্ত মুঠোফোনের ব্যবহার শিশুদের সামাজিক দক্ষতা ও মনস্তাত্ত্বিক উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করে। ফলে শিশুদের মুখোমুখি যোগাযোগ ও হাতের কাজের প্রতি অনীহা তৈরি হয়। শিশুদের শিক্ষার কাজে ডিভাইস লাগতে পারে, কিন্তু সেটা প্রয়োজনের অতিরিক্ত নয়।

অধ্যাপক গোপেন কুমার কুন্ডু, সাবেক চেয়ারম্যান, শিশু নিউরোলজি বিভাগ, বিএসএমএমইউ

সূত্র: প্রথম আলো. প্রকাশ: ০৬ আগস্ট ২০২৩, ১৩: ০৫